শিরোনাম:

রেমিট্যান্সে এগিয়ে থাকলেও নিরাপত্তা ও সামাজিক সংকটে পিছিয়ে ফেনীর আফ্রিকান অভিবাসীরা

সেপ্টেম্বর ০৮, ২০২৬


নিরাপত্তার স্বার্থে লোহার গ্রিল বেষ্টিত একটি আফ্রিকান স্পাজা শপে ব্যবসা পরিচালনা করছেন একজন বাংলাদেশি। সংগৃহীত ছবি

মোহাম্মদ আবদুল্লাহ মজুমদার

ফেনীর ছাগলনাইয়ার পাঠাননগর গ্রামের এনামুল হক। ২০১১ সালে মধ্যস্বত্বভোগীদের সাথে চুক্তি করে আফ্রিকার দেশ মোজাম্বিকে পাড়ি জমান। ২-৩ বছরের মধ্যে সেখানে গড়ে তোলেন বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। প্রতিমাসে দেশে থাকা স্বজনদের কাছে পাঠাতে থাকেন লাখ লাখ টাকার রেমিট্যান্স। ২০১৬ সাল নাগাদ সেখানে ব্যবসা করে দেশে গড়ে তোলেন কোটি টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ। ততদিনে বাবা, মা ও বোনরা একমাত্র ভাই এনামকে নিয়ে স্বপ্ন দেখা শুরু করেছেন। এবার ভাই দেশে এসে বিয়ে করবে, স্বপ্নের সংসার হবে। মা-বাবাসহ সকল আত্মীয়দের নিয়ে সরগম থাকবে বাড়িঘর। 
মোজাম্বিকে গিয়ে পৈত্রিক বাড়ি ছাড়াও ফেনী ও ছাগলনাইয়াসহ কয়েকটি শহুরে বাড়ির মালিক হয়েছেন এনাম। সোনাদানা ও ব্যাংকে গচ্ছিত নগদ টাকা তো আছেই। 
২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরের কোন একটি দিন হঠাৎ খবর আছে এনাম আর নেই। ব্যবসায়িক দ্বন্ধে তাকে খুন করেছে সেখানকার ডাকাতদল। পরে জানা যায় সে দেশের সংস্কৃতি অনুযায়ী সে দেশের এক নারীকে ‘সাময়িক বিয়ে’ করেছিলেন এনাম। মাতাল ও বন্দুকধারী ডাকাতদলের সাথে তার সাময়িক স্ত্রীর যোগসাজোসে খুন হন এনাম। খুন হওয়ার পর তার গড়ে তোলা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও স্ত্রীর কাছে থাকা গচ্ছিত অর্থও আত্মসাত করে নেয় ডাকাতদল। 
এদিকে তার মৃত্যুর খবরে শোকে স্তব্দ হয়ে যায় মা-বাবা ও আত্মীয়স্বজনসহ পুরো এলাকা। এরপর তার মরদেহ দেশে আনার ব্যপারে কয়েকদিন আলোচনা হলেও পরে মোজাম্বিকের সরকারের নিকট থেকে কিছু টাকা পাওয়ার প্রলোভনে এনামের মরদেহ সেখানেই দাফন করতে রাজি হয়ে যান তার পরিবার। এনামের লাশের বিনিময়ে পরিবার কিছু টাকাও পরে পেয়েছিলো। এছাড়াও ২০১১ সাল থেকে দেশে বাবার কাছে গড়া কয়েক কোটি টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি তো পড়েই আছে। তবুও লাশের বিনিময়ে পাওয়া কয়েকটি টাকার লোভ ছাড়তে পারেনি এনামের পরিবার। 
এনামের এমন অনেকেই আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে গিয়ে ডাকাতদলের আক্রমণে লাশ হয়ে ফেরার বেদনাদায়ক গল্প তৈরি করেছেন। শুধু ফেনী জেলায় এর সংখ্যা গত কয়েক বছরে প্রায় ২০-২২ জন।
দক্ষিণ আফ্রিকার জোহান্সবার্গে বসবাসরত বাংলাদেশি অভিবাসী ফারুক জানান, আফ্রিকার দেশগুলোতে স্বাভাবিকভাবেই আন্তর্জাতিক অভিবাসীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। সেখানে বাংলাদেশি অভিবাসীদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। দক্ষিণ আফ্রিকায় বাংলাদেশিদের জীবনের বাস্তবতা অনেকটা জটিল এবং আকর্ষণীয়। দেশের বিভিন্ন শহরে বাংলাদেশি অভিবাসীরা খুঁজে পেয়েছেন নতুন জীবন, কিন্তু সেই সঙ্গে তারা নানা ধরনের সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করছেন। ফেনী ও এর আশেপাশের এলাকার প্রায় লক্ষ্যাধিক অভিবাসী মোজাম্বিক, জিম্বাবুয়ে, লেসেথো, কঙ্গো, সোয়াজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা, মৌরতানিয়া, মালি, কেনিয়া এবং তানজানিয়াসহ আফ্রিকার দেশগুলোতে বিভিন্ন ধরণের ব্যবসায় জড়িত। বাংলাদেশিদের দ্বারা পরিচালিত দোকানগুলোকে আফ্রিকায় স্থানীয়ভাবে স্পাজা শপ বলা হয়। 
আফ্রিকার দেশগুলোতে বাংলাদেশি অভিবাসীরা মূলত ব্যবসা এবং কাজের উদ্দেশ্যে আসেন। পণ্য বিক্রি, রেস্তোরাঁ ব্যবসা, এবং বিভিন্ন ছোট ব্যবসায় তারা যুক্ত হন। একদিকে, দক্ষিণ আফ্রিকা তাদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে, অন্যদিকে, সেখানে অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জনের সুযোগও থাকে। বিশেষত, শহরগুলোতে ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য নতুন বাজারের সন্ধান করছেন অনেক বাংলাদেশি।
ফারুক বলেন, আফ্রিকার দেশগুলোতে থাকতে হলে সেখানে একজন নারীকে স্ত্রী বা প্রেমিকা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে রাখতে হয়, নাহয় সেখানে নিরাপত্তা পাওয়া যায় না। আবার সেখানকার কথিত স্ত্রী বা প্রেমিকার অভিযোগই একজন অভিবাসীর নিরাপত্তাহীনতার চূড়ান্ত কারণ। যার প্রেক্ষিতে দেশে স্ত্রী-সন্তান থাকা সত্ত্বেও আফ্রিকান বাংলাদেশিরা স্থানীয় একজন নারীর সাথে সম্পর্ক স্থাপন করতে হয় বাধ্য অনেকটা বাধ্য হয়েই।

 

আফ্রিকায় বাংলাদেশি অভিবাসীদের সামাজিক চ্যালেঞ্জ

দক্ষিণ আফ্রিকার অভিবাসী ফারুক আরো জানান, প্রথমে দালালের মাধ্যমে দু’একজন আফ্রিকায় গেলেও পরবর্তীতে আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীর হাত ধরে ফেনীসহ আশপাশের এলাকা লোকজন আফ্রিকার দেশগুলোতে পাড়ি জমান। বাংলাদেশি অভিবাসীরা যখন আফ্রিকায় নতুন জীবন শুরু করেন, তখন তারা সমাজের মধ্যে সঠিকভাবে সংযুক্ত হতে অনেক ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হন। ভাষাগত বাধা, সাংস্কৃতিক পার্থক্য এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের সাথে সম্পর্ক তৈরি করতে কিছুটা সময় লেগে যায়। অনেকেই আফ্রিকার স্থানীয় ভাষা এবং সংস্কৃতির সাথে মানিয়ে নিতে কঠোর পরিশ্রম করেন, তবে কিছু ক্ষেত্রে তারা এক ধরনের বিচ্ছিন্নতা অনুভব করেন।
দক্ষিণ আফ্রিকায় বাংলাদেশি কমিউনিটি বিভিন্ন শহরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, বিশেষ করে কেপটাউন, প্রিটোরিয়া, এবং জোহান্সবার্গে। এখানকার বাংলাদেশি ব্যবসায়ী, শিক্ষক, শ্রমিক, এবং বিভিন্ন পেশায় জড়িত। তাদের মধ্যে একটি সুদৃঢ় কমিউনিটি গড়ে উঠেছে, যারা একে অপরকে সহায়তা করে এবং পরস্পরের সাথে যোগাযোগ রাখে। যদিও তারা স্থানীয় সমাজের মধ্যে মিশে যেতে চেষ্টা করেন, তবুও মাঝে মাঝে বৈষম্য এবং প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়। 
জোহান্সবার্গ প্রবাসী ফারুক জানান, আফ্রিকার কিছু অঞ্চলে বাংলাদেশি অভিবাসীরা কৃষি এবং শিক্ষাখাতেও অবদান রাখছেন। তারা পলিকালচার, মাছ চাষ, এবং অন্যান্য কৃষি খাতে নতুন ধারণা নিয়ে এসেছেন। এছাড়া, অনেক বাংলাদেশি অভিবাসী স্থানীয় স্কুলগুলোতে শিক্ষক হিসেবে কাজ করছেন। ব্যবসা-বাণিজ্যেও স্থানীয় আফ্রিকানদের চেয়ে বাংলাদেশি অভিবাসীরা বেশ পটু ও বিচক্ষণ ভূমিকার সাথে অবদান রেখে চলেছেন। তবে স্থানীয় সন্ত্রাসীদের অস্ত্রের ঝনঝনানি ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার অভাবে সবসময় অধিকতর ঝুঁকি নিয়েই ব্যবসা পরিচালনা করতে হয়। কয়েকদল সন্ত্রাসী সার্বক্ষণিক হামলা ও লুটপাটের সুযোগ খুঁজতেই ব্যস্ত থাকে মালি, মোজাম্বিক এবং কঙ্গোসহ বেশ কয়েকটি রাষ্ট্রে। এছাড়া সোমালিয়া ও জিবুতিসহ বেশ কয়েকটি রাষ্ট্রে লুটপাট এবং দস্যুতাই হলো অধিকাংশ জনগোষ্ঠির  বৈধ ও একমাত্র পেশা। যেকোন সময় সন্ত্রাসী হামলার আশঙ্কা থাকায় সেখানকার দোকান বা স্পাজা শপগুলোর সামনে লোহার গ্রিল দিয়ে ব্যবসা করেন বাংলাদেশি প্রবাসীরা। 

 

আফ্রিকায় অভিবাসনের সম্ভাবনা

আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে বসবাসরত বেশ কয়েকজন বাংলাদেশিদের সাথে কথা বলে জানা যায়, আফ্রিকায় বাংলাদেশের অভিবাসীদের ভবিষ্যত খুবই প্রতিশ্রুতিশীল। বর্তমানে আফ্রিকার দেশগুলোতে থাকা ফেনী ও আশপাশের জেলাগুলোর অভিবাসীরা যে পরিমাণ রেমিট্যান্স দেশে পাঠান তা মধ্যপ্রাচ্য বা মালয়েশিয়ায় থাকা প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সে প্রায় কয়েকগুন। সরেজমিনে আফ্রিকার দেশগুলোতে থাকা কয়েকজন প্রবাসীর বাড়ি ঘুরে দেখা তার বাস্তব চিত্রও দেখতে পাওয়া যায়। আফ্রিকা মহাদেশের প্রবাসীরা অন্য যেকোন দেশের প্রবাসীদের চেয়ে তুলনামূলক বেশি রেমিট্যান্স পাঠানোর কথাও স্বীকার করেন তাদের স্বজনরা। আফ্রিকা মহাদেশের স্থানীয় অর্থনীতি উন্নতির পথে এবং প্রতিনিয়ত সেখানে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে। এর সাথে, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ এবং ব্যবসায়িক সম্পর্ক উন্নতি লাভ করছে। এছাড়া, নতুন শিক্ষাগত সুযোগ ও সংস্কৃতি বিনিময়ের মাধ্যমে, তারা আরও ভালোভাবে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে সক্ষম হবেন।
সেখানকার প্রবাসীদের মধ্যে বর্তমানে যে সংকট বা সংঘাত আছে সেসব মূলত বাংলাদেশি অভিবাসীদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণেই হয়ে থাকে। বাংলাদেশিরাই সেখানকার ডাকাতদলকে নিজেদের স্বার্থে কাজে লাগান। ডাকাতদলের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ না থাকা ও বেসামরিক নাগরিকের কাছে বিচ্ছিন্নভাবে আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহারের কারণে হত্যাকাণ্ডই সংঘাতের শেষ গন্তব্য হয়। 
বাংলাদেশি অভিবাসীরা দক্ষিণ আফ্রিকায় নানা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হলেও, তাদের অদম্য ইচ্ছাশক্তি এবং পরিশ্রমের মাধ্যমে তারা সেখানে নতুন জীবন গড়ে তুলছেন। কর্মসংস্থান, ব্যবসা এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়ের মাধ্যমে তারা এই দেশটিতে নিজেদের জন্য এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছেন। আফ্রিকায় বাংলাদেশিদের জন্য অনেক কিছুই সম্ভব, যদি তারা ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে এবং দেশটির উন্নয়নে অংশ নেয়। তবে এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশিদের জন্য আফ্রিকায় কূটনৈতিক চ্যানেল তৈরি করা জরুরি। 
ফেনী প্রবাসী কল্যাণ অফিসের সহকারী পরিচালক মোঃ মাসুদ পারভেজ জানান, আফ্রিকার অভিবাসনের ব্যপারে সরকারি দফতরে কোন পরিসংখ্যান বা নির্দিষ্ট অভিবাসন পদ্ধতি নেই। তবে বিশ্বের যেকোন দেশে অভিবাসীরা সংকটে পড়লে সরকার পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। বর্তমানে আফ্রিকার দেশগুলোতে স্থাপিত দূতাবাসগুলোও অভিবাসীদের কনস্যুলেট ও আইনি সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। তবে প্রবাসীদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ ও সেসব দেশের জাতীয় রাজনীতিতে অস্থিরতা থাকায় অন্যান্য দেশের মতো প্রবাসীরা সকল কনস্যুলেট সেবা নিয়ম অনুযায়ী গ্রহণ করতে পারেন না।